Total Pageviews

Feedjit Live

This is default featured post 1 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.This theme is Bloggerized by Lasantha Bandara - Premiumbloggertemplates.com.

This is default featured post 2 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.This theme is Bloggerized by Lasantha Bandara - Premiumbloggertemplates.com.

This is default featured post 3 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.This theme is Bloggerized by Lasantha Bandara - Premiumbloggertemplates.com.

This is default featured post 4 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.This theme is Bloggerized by Lasantha Bandara - Premiumbloggertemplates.com.

This is default featured post 5 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.This theme is Bloggerized by Lasantha Bandara - Premiumbloggertemplates.com.

Showing posts with label সম্পাদকীয়. Show all posts
Showing posts with label সম্পাদকীয়. Show all posts

Monday, August 15, 2011

তবু কেন রাষ্ট্রধর্ম(সাত বিশিষ্ট ব্যক্তির ভাবনা)

সালাহউদ্দীন আহমদ  কবীর চৌধুরী  সরদার ফজলুল করিম  জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী  সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী  আনিসুজ্জামান  কাইয়ুম চৌধুরী |

সালাহউদ্দীন আহমদ, কবীর চৌধুরী, সরদার ফজলুল করিম, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আন
সালাহউদ্দীন আহমদ, কবীর চৌধুরী, সরদার ফজলুল করিম, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আনিসুজ্জামান ও কাইয়ূম চৌধুরী
বাংলাদেশের এক সামরিক শাসক নিজের ক্ষমতার ভিত্তি তৈরি করতে কাছে টেনেছিলেন মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধীদের। তিনি প্রধানমন্ত্রী করেছিলেন এমন একজনকে, যিনি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে গিয়েছিলেন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কথা বলতে। তিনি সামরিক ফরমানবলে দেশের সংবিধান সংশোধন করে রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা বর্জন করেছিলেন, ধর্মাশ্রিত রাজনীতি করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন এবং সংবিধানের সূচনায় বিসমিল্লাহ্ যোগ করেছিলেন।
বাংলাদেশের আরেক সামরিক অভ্যুত্থানের নায়কের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সারা দেশে যখন তুমুল আন্দোলন চলছিল, তখন নিজের ক্ষমতা নিরাপদ করার আশায় তিনি ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করার বিধানসংবলিত এক সাংবিধানিক সংশোধনী জাতীয় সংসদকে দিয়ে পাস করিয়ে নিয়েছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে সেদিন আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ অনেক রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজ প্রতিবাদ জানিয়েছিল এবং এককভাবে ও সমষ্টিগতভাবে অন্তত তিনটি মামলা হাইকোর্টে রুজু হয়েছিল।
দেশের মানুষ কেউ কখনো সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতার উচ্ছেদ চায়নি, রাষ্ট্রধর্মের প্রবর্তনও চায়নি। ক্ষমতাসীন ব্যক্তি ও গোষ্ঠী নিজের স্বার্থে এসব উদ্যোগ নিয়েছিল এবং, বলা যায়, দেশের অধিকাংশ মানুষ তা মেনে নিয়েছিল। তবে সচেতন জনগোষ্ঠী বরাবরই এসব ব্যবস্থাকে বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর বিরোধী এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী বলে গণ্য করে এসেছে। তারা বারবার করে ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে ফিরে যাওয়ার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে দাবি জানিয়েছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতিগুলো গৃহীত হয়েছিল পাকিস্তান-আমলে পূর্ব বাংলার মানুষের দীর্ঘকালের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। এই প্রক্রিয়ায়ই ১৯৫১ সালে পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ গঠিত হয় সে-সময়ের একমাত্র অসাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠানরূপে; ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের অব্যবহিত পরে অসাম্প্রদায়িক ছাত্র-সংগঠনরূপে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন ও অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলরূপে গণতন্ত্রী দলের প্রতিষ্ঠা ঘটে। এই প্রক্রিয়ায়ই পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের নাম থেকে এবং তারপরে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নাম থেকে মুসলিম শব্দ বর্জিত হয়। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের একুশ দফার শীর্ষদেশে নীতি হিসেবে যদিও অঙ্গীকার করা হয় যে, ‘কোরান ও সুন্নার মৌলিক নীতির খেলাফ কোন আইন প্রণয়ন করা হইবে না এবং ইসলামের সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের ভিত্তিতে নাগরিকগণের জীবনধারণের ব্যবস্থা করা হইবে’, তবু এ-নীতি কোনো দফা হিসেবে ঘোষিত হয়নি এবং এতে রাষ্ট্রের ইসলামিকরণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়নি। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম শাসনতন্ত্র (তখন তাই বলা হতো) প্রণয়নের সময়ে গণপরিষদে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রের ইসলামি প্রজাতন্ত্র নামকরণের বিরোধিতা করে। একই সময়ে পূর্ব পাকিস্তান ব্যবস্থাপক পরিষদে যুক্ত নির্বাচনপ্রথার পক্ষে প্রস্তাব গ্রহণ করে পাকিস্তানের দ্বিজাতিতত্ত্বের মূলে কুঠারাঘাত করা হয় এবং পূর্বাঞ্চলে এই ব্যবস্থা পাকিস্তানের শাসনতন্ত্রের বিধানরূপে গৃহীত হয়। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি এবং দলটি বিভক্ত হলে এর উভয় অংশ, বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন এবং অধিকাংশ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ক্রমশ ধর্মনিরপেক্ষ মনোভাবের প্রসার ঘটাতে সাহায্য করে। অপরপক্ষও নিষ্ক্রিয় ছিল না। তারই পরিপ্রেক্ষিতে, ১৯৬৯ সালে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারের বিরুদ্ধে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন। ১৯৭০ সালে জেনারেল ইয়াহিয়া খান যে-আইনগত কাঠামো আদেশ জারি করেন, তার ২০ ধারায় বলা হয়েছিল যে, পাকিস্তান পরিচিত হবে ইসলামি প্রজাতন্ত্র বলে, যে-ইসলামি ভাবাদর্শ পাকিস্তানের ভিত্তি তা রক্ষা করা হবে এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান হবেন একজন মুসলমান। ১৯৭০ সালের সেপ্টেম্বরে আরো দুটি ধারার সঙ্গে ছাত্রলীগ এই ধারা সম্পর্কে আপত্তি জানায় এবং আদেশটি বাতিলের দাবি করে। ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ছাত্র ইউনিয়ন প্রস্তাব করে যে, ‘রাষ্ট্র হইবে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র’।
বাংলাদেশ যে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হবে, মুক্তিযুদ্ধের কালে আমাদের নেতারা সেকথা অনেকবার বলেছিলেন। শুধু প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ নন, অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ এম কামরুজ্জামান, এমনকি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমদও একাধিক বক্তৃতায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় তিন নীতির—গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার—ঘোষণা দিয়েছিলেন। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিরূপে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে রেসকোর্সের জনসভায় বঙ্গবন্ধু সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন যে, ‘বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র “বাংলাদেশ” রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা।’ পরে তিনি এর সঙ্গে আরো একটি নীতি যোগ করেন—জাতীয়তাবাদ। ১৯৭২ সালে এই চার নীতিই বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্র-পরিচালনার মূলনীতিরূপে গৃহীত হয়।
সুতরাং এ-কথা জোর দিয়ে বলা চলে যে, রাষ্ট্র-পরিচালনার এইসব মূলনীতি হঠাৎ করে কারো ইচ্ছায় প্রণীত হয়নি, কারো স্বার্থরক্ষার জন্যেও নির্ণীত হয়নি। এ হলো জনগণের দীর্ঘকালের সংগ্রামের ফল, নেতাদের সুচিন্তিত পথনির্দেশনার পরিণাম। অন্য কোনো রাষ্ট্রের প্রভাবে বা অনুকরণে নয়, অন্য কোনো রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতা বা কৃতজ্ঞতাস্বরূপও নয়, এ ছিল একান্তই আমাদেরই চয়িত আদর্শ। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ১৯৪৯ সালে যখন ভারতের সংবিধান প্রণীত হয়, তখন রাষ্ট্রপরিচালনার নির্দেশক নীতিগুলোর মধ্যে সমাজতন্ত্র বা ধর্মনিরপেক্ষতার স্থান ছিল না। সংবিধানের প্রস্তাবনায় সে-দেশের রূপ নির্ণীত হয়েছিল সার্বভৌম গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র (Sovereign democratic republic) বলে। পরে ১৯৭৭ সালে গৃহীত দ্বিচত্বারিংশ সংশোধনীর দ্বারা তা সার্বভৌম সমাজতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র (Soverign socialist secular democratic republic) করা হয়। ততদিনে আমাদের রাষ্ট্রনায়কেরা সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ জলাঞ্জলি দিয়েছেন।
রাষ্ট্রধর্মের প্রবর্তন বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে আঘাত করেছে। রাষ্ট্রধর্মের প্রবর্তন বাংলাদেশের মানুষকে মুসলমান (রাষ্ট্রধর্মের অনুসারী) এবং অমুসলমানে (শান্তিতে পালনযোগ্য অন্যান্য ধর্মের অনুসারী) বিভক্ত করেছে। রাষ্ট্রধর্মের প্রবর্তন বাংলাদেশের অমুসলমান নাগরিকদের মধ্যেও এক ধরনের স্বাতন্ত্র্যবাদের সূচনা করেছে। রাষ্ট্রধর্ম-প্রবর্তনের পরে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্যপরিষদের প্রতিষ্ঠা তারই দৃষ্টান্ত। ১৯৯০, ১৯৯২ ও ২০০১ সালের সাম্প্রদায়িক নির্যাতনের ঘটনা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মনে অনাস্থার সৃষ্টি করেছে। তার ফলে একদিকে ঘটেছে নীরব দেশত্যাগ, অন্যদিকে দেখা দিয়েছে তাদের স্বার্থরক্ষার জন্য স্বতন্ত্র নির্বাচনপ্রথার পুনঃপ্রবর্তন কিংবা সংরক্ষিত সংসদীয় আসনের চিন্তা।
বিশেষ ধর্মের প্রতি রাষ্ট্রের পক্ষপাতের ফলে যে নাগরিকদের মধ্যে বিভেদ ও বৈষম্য সৃষ্টি করা হয়, একথা অনেকে মানতে চান না। তাঁরা যুক্তরাজ্যের দৃষ্টান্ত দেন। স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতীয় রাষ্ট্রের উদ্ভবের পরে ইউরোপে ক্রমে ধর্ম ও রাষ্ট্রের—স্টেট ও চার্চের—পৃথকীকরণ ঘটে এবং সকল নাগরিকের ইহলৌকিক কল্যাণসাধন রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলে স্বীকৃত হয়। তা সত্ত্বেও ইউরোপের সব দেশে রাষ্ট্র ও ধর্ম পৃথক হয়নি। যুক্তরাজ্যের রাজা ও রানী চার্চ অফ ইংল্যান্ডের রক্ষাকর্তা—এই অর্থে অ্যাংলিকান চার্চের ধর্মই যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রীয় ধর্ম। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার একাধিক দেশ, আয়ারল্যান্ড, ইতালি ও স্পেনেও রাষ্ট্র বিশেষ বিশেষ ধর্মের আনুকূল্য করে থাকে—তবে পৃষ্ঠপোষকতা বলতে আমরা যেমন বুঝি, তেমন নয়। সেসব দেশে আমাদের দেশের মতো ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা পীড়িত হয় না। অন্যদিকে ক্যাথলিক ধর্মের অসাধারণ প্রাধান্য সত্ত্বেও ফ্রান্স ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র, প্রোটেস্টান্টদের গরিষ্ঠতা সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। ইসলামি রাষ্ট্রসংস্থার (ওআইসি) অর্ধেক সদস্য-রাষ্ট্রেরই রাষ্ট্রধর্ম বলে কিছু নেই। ইন্দোনেশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত কিংবা সিরিয়ার মতো দেশ রাষ্ট্রধর্ম স্বীকার করে না। তুরস্ক কেবল ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র নয়, তার সংবিধানের যে-তিনটি বিধান কোনোমতে সংশোধনযোগ্য নয়, ধর্মনিরপেক্ষতা তার একটি; সেদেশে সম্পত্তির উত্তরাধিকার এবং নারীর স্বাধীনতা বিষয়ে ধর্মনিরপেক্ষ আইন প্রচলিত। সুতরাং কেবল উদাহরণ দিয়ে লাভ নেই, স্বদেশের অভিজ্ঞতা ও পরিস্থিতির বিবেচনায় এ-বিষয়ে করণীয় নির্ণয় করা আবশ্যক। ফরাসি বিপ্লবের আদর্শ ফ্রান্সকে ধর্মনিরপেক্ষ থাকার প্রেরণা দিয়েছে; আদি বসতিস্থাপনারীদের ধর্মীয় নিপীড়নভোগের অভিজ্ঞতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বিশেষ কোনো ধর্মের সঙ্গে যুক্ত থাকতে দেয়নি। পাকিস্তান আমলে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির যে-কুফল আমরা দেখেছি, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ধর্মের নামে যে-নিপীড়ন এখানে চলেছে এবং বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠায় সকল সম্প্রদায়ের মানুষের মিলিত সংগ্রামের যে-ইতিহাস আমরা রচনা করেছি, তার পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শগ্রহণই আমাদের পক্ষে স্বাভাবিক ও সংগত ছিল। আমরা ঠিক তাই করেছিলাম।
পঞ্চদশ সংশোধনীর বলে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার মূলনীতি ফিরে আসছে। কিন্তু বিসমিল্লাহ্ ও রাষ্ট্রধর্ম রয়ে যাচ্ছে। ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১২ অনুচ্ছেদে স্পষ্টই বলা হয়েছিল যে, ‘ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি বাস্তবায়নের জন্য (ক) সর্ব প্রকার সাম্প্রদায়িকতা, (খ) রাষ্ট্র কর্তৃক কোন ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদাদান, (গ) রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার (ঘ) কোন বিশেষ ধর্মপালনকারীর প্রতি বৈষম্য বা তাঁহার উপর নিপীড়ন বিলোপ করা হইবে।’ একইসঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ এবং রাষ্ট্রধর্মের বিধান—অর্থাৎ রাষ্ট্র কর্তৃক ইসলামকে রাজনৈতিক মর্যাদাদান—কীভাবে পাশাপাশি থাকতে পারে, তা আমাদের স্বল্পবুদ্ধিতে বোধগম্য নয়।
বাংলাদেশের জন্যে রাষ্ট্রধর্ম যে আবশ্যক, তা কীভাবে নির্ণীত হয়েছে? একথা কি আমরা ভুলে গেছি যে, বাংলাদেশের যে-একমাত্র শাসক দেশবাসীকে রাষ্ট্রধর্ম উপহার দিয়েছিলেন, জনসাধারণ আন্দোলন করে তাঁকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করে? আওয়ামী লীগকে ধর্মনিরপেক্ষতার সমর্থক জেনেও কি দেশের মানুষ একাধিকবার তাকে ক্ষমতায় আনেনি? তাহলে কাদের মুখ চেয়ে আমরা রাষ্ট্রধর্ম রাখতে চাইছি এবং ধর্মনির্বিশেষে সকল নাগরিককে দিয়ে বিসমিল্লাহ্ বলাতে চাইছি?
রাষ্ট্রধর্মের বিধান বাংলাদেশে ধর্মব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করেছে। তাঁরা মুসলমান-অমুসলমানে পার্থক্য করেছেন, শিয়া ও আহমদিয়াদের অমুসলমান বলে ঘোষণা করেছেন এবং রাষ্ট্রের কাছে অনুরূপ ঘোষণা দাবি করেছেন। তাঁরা নারীপুরুষে বৈষম্যসৃষ্টির অভিপ্রায় প্রকাশ্যে জ্ঞাপন করেছেন। তাঁরা নারীপুরুষনির্বিশেষে মুরতাদ ঘোষণা করে মানুষকে পীড়ন করেছেন। তাঁরা নির্বিবাদে ফতোয়া দিয়ে ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করেছেন। এ থেকেও আমাদের শিক্ষা নেওয়ার রয়েছে।
বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রে সকল নাগরিকের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে রাষ্ট্রধর্মের বিধান বর্জন করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রাখতে হলে রাষ্ট্রধর্মের বিধান বিলোপ করতে হবে। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে সৃষ্ট পাকিস্তান-প্রতিষ্ঠার পরে রাজনৈতিক নেতারা আমাদের ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শে সৃষ্ট বাংলাদেশে আমাদের নেতারা কি সকল নাগরিককে সেই আদর্শ বজায় রাখার প্রেরণা দেবেন না?
লেখকবৃন্দ: দেশের বিশিষ্ট নাগরিক।
প্রথম আলো

Tuesday, July 26, 2011

ক্ষমা দেবধর্ম

সৈয়দ আবুল মকসুদ
প্রাচ্যে সেই বৈদিক যুগেই ঋষিরা বলে গেছেন: ক্ষমা দেবধর্ম। দেবতারা চাইলে যে কাউকে ক্ষমা করে দিতে পারেন। মধ্যপ্রাচ্যে প্রবর্তিত ইসলামি ধর্মশাস্ত্রেও বলা হয়েছে: আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হও। আল্লাহর অসংখ্য গুণের মধ্যে একটি তাঁর ক্ষমাশীলতা। সাংঘাতিক পাপীতাপীও তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলে তিনি ক্ষমা করে দেন।
আমার এক পাঠিকা অনেকটা বিচলিতভাবে আমাকে অনুরোধ করেছেন: ‘ক্ষমা নিয়ে কিছু লিখুন তো!’ কিসের ক্ষমা, কাকে ক্ষমা, কী কারণে ক্ষমা—তা তিনি কিছু বলেননি। রাজনীতির ক্ষমা, না সাহিত্যের ক্ষমা; অর্থনীতির অর্থাৎ শেয়ারবাজারের অপরাধীদের ক্ষমা, না টেন্ডার-সংক্রান্ত মারামারির ক্ষমা; টাকা পাচারকারীদের ক্ষমা, না ছাত্রী ধর্ষণের অপরাধীকে ক্ষমা; কূটনীতিকদের অপকর্মের ক্ষমা, নাকি খুনের মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ওরফে নেতাকে ক্ষমা—তা তিনি পরিষ্কার করে বলেননি।
আইন-আদালতের জগতে ক্ষমা বলতে কী বোঝায় তা আমার জানার কথা নয়। আইন সাহিত্য আমার অপঠিত। মাস তিনেক ঘোরাঘুরি করেছিলাম আলীম আল রাজীর পাঠশালায়। আইনের ক-খ শুরু করেছিলাম, ক্ষমার অধ্যায় পর্যন্ত যাওয়ার আগেই ইস্তফা দিই। তবে আইন সাহিত্যে না হলেও বাংলা সাহিত্যে কোথায় ক্ষমা চাওয়াচাওয়ি আছে, তা কিছু জানা আছে।
আমাদের উপজেলার কর্মকর্তাদেরও গুরুদেব, যেন তারা সবাই শান্তিনিকেতনের তিরিশের দশকের ছাত্র, ম্যালা বিষয়ে লিখে গেছেন। নানা রকম ক্ষমার কথাও আছে তাঁর রচনায়। তবে খুনখারাবির আসামিকে ক্ষমা করার কথা তিনি বলে যাননি। তাঁর চিত্রাঙ্গদা গীতিনাট্যে চিত্রাঙ্গদাকে অর্জুনের উদ্দেশে বলতে শুনি:
আমি তোমায় করিব নিবেদন
আমার হূদয় প্রাণ মন।
শিল্পা শেঠি বা মাধুরী দীক্ষিতের মতো সুন্দরী চিত্রাঙ্গদার ওই প্রস্তাব আমাদের মতো মানুষকে দিলে বলতাম: অতি উত্তম। কিন্তু অর্জুন অন্য রকম। তিনি বলেছেন:
ক্ষমা করো আমায়, আমায়—
বরণযোগ্য নহি বরাঙ্গনে—
ব্রহ্মচারী ব্রতধারী।
গুরুদেবের পরিশোধ নাট্যগীতি আপনারা অনেকেই শুনেছেন। বজ্রসেন বলছেন:
কাঁদিতে হবে রে, রে পাপিষ্ঠা
জীবনে পাবি না শান্তি।
প্রত্যুত্তরে শ্যামা বলছেন:
ক্ষমা করো নাথ, ক্ষমা করো
এ পাপের যে অভিসম্পাত
হোক বিধাতার হাতে নিদারুণতর
তুমি ক্ষমা করো।
ক্ষমা সম্পর্কে গুরুদেবের আরও কথাবার্তা আছে। তাঁর চণ্ডালিকা-য় আনন্দ বলছে:
জল দাও, আমায় জল দাও।
প্রকৃতি তার জবাবে বলছে:
ক্ষমা করো প্রভু, ক্ষমা করো মোরে
আমি চণ্ডালের কন্যা
মোর কূপের বারি অশূচি।
দুনিয়াতে নানা রকমের ক্ষমা চাওয়া আর ক্ষমা করা আছে। ইচ্ছা করে কোনো তরুণীর গায়ে একটু ঘষা দিয়ে তাকে বলতে পারেন: ক্ষমা করুন। এ ক্ষেত্রে যদি ক্ষমা আপনি পান, তা নিয়ে পত্রপত্রিকা লেখালেখি করবে না। গোটা কয়েক মার্ডার করে আদালতের রায়ে যদি আপনি প্রাণদণ্ড পান এবং সেই প্রাণদণ্ড যদি কলমের এক খোঁচায় মওকুফ হয়, তখন কাগজগুলো কিছু লিখুক বা না লিখুক ক্ষমাকারীর বিবেক কী বলছে, তা জানার আগ্রহ যে কারও হতে পারে।
ক্ষমা বলতে রবীন্দ্রনাথের নায়ক-নায়িকারা যা বোঝে, আমাদের রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমা তা নয়। আমরা এমন এক রাষ্ট্রে বাস করছি যেখানে অপরাধী হলেই হবে না, তার দলীয় পরিচয়টিই প্রধান। একেক আমলে একেক ধর্মীয় পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ। তার বাড়ি কোন জেলায়। এসব পরিচয় যদি ঠিকঠাক থাকে তা হলে কেউ ছাত্রী ধর্ষণ ও সাত খুন করেও পার পেয়ে যাবে। দলীয় ও ধর্মীয় পরিচয় যদি মিলে যায়, সোনায় সোহাগা। ওই ধর্ষকের ব্যাপারে মানবাধিকারকর্মীরা টুঁ-শব্দটিও করবেন না—রাস্তার মধ্যে আদম বন্ধন যতই হোক তার শাস্তির দাবিতে। সাংগঠনিক, দলীয় ও ধর্মীয়—এই তিন পরিচয় যদি খাপে খাপে মিলে যায়, তা হলে কোনো কূটনীতিকের কুচ পরোয়া নেই। তিনি তাঁর গাড়িতে অন্য রাষ্ট্রের পতাকা ওড়াতে পারেন, বন্ধুরাষ্ট্রের কূটনীতিকের সুন্দরী স্ত্রীকে বিরক্ত করতে পারেন, কারও হোন্ডার পেছনে বসে শুঁড়িখানায় বা অন্য কোনো আলয়ে যেতে পারেন, চাঁদার খাতা নিয়ে ঘুরে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা রোজগার করতে পারেন। তাঁর সম্পর্কে কাগজের লোকেরা অভিযোগ করলে, তাঁর মন্ত্রী বলবেন, ছিঃ, ওসব বলতে নেই, এখন আমরা সেক্যুলার। ক্ষমা তাঁকে করব না তো কাকে করব?
অপরাধীর ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নেই। সত্য ও ন্যায়বিচার ব্যক্তি ও ধর্মনিরপেক্ষ। অপরাধী যত প্রিয়জনই হোক তাকে ক্ষমা করা যায় না। উপমহাদেশের মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে মহাত্মা গান্ধীর পত্নী কস্তুরবা গান্ধীর ত্যাগ বিরাট। একবার তিনি ভুলবশত আশ্রমের সম্ভবত মাত্র চারটি টাকা নিজের প্রয়োজনে খরচ করেছিলেন। হিসাব না মেলায়, গান্ধীজি তদন্ত করে দেখলেন ও-টাকা কস্তুরবা ব্যয় করেছেন। ক্ষুব্ধ গান্ধী তাঁর অনুসারীদের সামনেই স্ত্রীকে ভৎর্ সনা করে বললেন, এই টাকা জনগণের। তুমি তা ব্যয় করেছ। এটাকে বলে চুরি। তোমার নামে পুলিশের কাছে চুরির অভিযোগে কেস করা যায়।
গান্ধীজি তাঁর সর্বত্যাগী পত্নীকেও ক্ষমা করেননি। এর নাম নৈতিকতা।
সৈয়দ আবুল মকসুুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।  প্রথম আলো

সবকিছু ভেঙে পড়ে

থিংস ফল অ্যাপার্ট। ‘সবকিছু ভেঙে পড়ছে। কেন্দ্র আর কোনো কিছু ধরে রাখতে পারছে না। জগৎ জোড়া শুধুই নৈরাজ্য।’ লিখেছিলেন কবি ডব্লিউ বি ইয়েটস। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে। বাংলাদেশেও হঠাৎ করে মনে হচ্ছে সবকিছু ভেঙে পড়ছে। চারদিকে কেবল দুঃসংবাদ। দুঃসংবাদের চাপে সুসংবাদ উধাও।
এই মহাজোট সরকার তার আড়াই বছর পার করেছে কেবল। আড়াই বছরের মাথায় এসে মনে হচ্ছে, সরকার যা কিছু করছে, সবই তার বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে। সরকার যদি বা কিছু না-ও করে, দেশে যেসব দুর্ঘটনা ঘটছে তার দোষ কেবল সরকারের ঘাড়ে নয়, সরকারি দলের ওপরও এসে আছড়ে পড়ছে।
এত তাড়াতাড়ি এমন হওয়ার কথা নয়। কেন এমন ঘটছে? একটা কারণ হতে পারে, সরকার জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলেছে। জনগণ তাদের ওপর বিরক্ত। দেখতে নারি, চলন বাঁকা। সরকারের ভালো কাজগুলোও আর মানুষের চোখে পড়ছে না। ব্যর্থতাগুলোই তাদের চোখে প্রকট হয়ে পড়ছে। সরকারের জনপ্রিয়তা যে কমে গেছে, স্থানীয় সরকারের নির্বাচনের ফল থেকে তা কিছুটা আঁচ করা যায়। কিন্তু সরকার জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে কেন? জনজীবনে সরাসরি আঁচ লাগে, এমন কিছু ব্যর্থতা বড় স্পষ্ট। জিনিসপত্রের দাম আসলেই খুব বেড়ে গেছে। সীমিত আয়ে আর সংসার চলে না। দিন যাপন করা যায় না। শেয়ারবাজারে ধস অসংখ্য পরিবারকে পথে বসিয়ে দিয়েছে। ছোট ছোট বিনিয়োগকারীর পকেট কেটে কতিপয় বড়লোক হাজার কোটি টাকা নিয়ে সটকে পড়েছেন। এবং এই বিপর্যয়ের জন্য যাঁরা দায়ী বলে মানুষ মনে করে, তাঁরা সরকারের উচ্চমহলের ঘনিষ্ঠ, অথবা সরকারেরই লোক। এসব বড় ঘটনা তো আছেই, নিত্যদিনের পথচলায় মানুষকে একটা বিশেষ প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে, তার নাম দলীয়করণ ও রাজনৈতিকীকরণ। যেখানে দলের দরকার নেই, সেখানেও সবকিছু করা হয় দলীয় পরিচয় বিবেচনা করে। যেখানে রাজনীতি টেনে আনার দরকার নেই, সেখানেও রাজনীতি ও রাজনীতিকেরা এসে হাজির হন এবং সবকিছু রাজনীতির ছায়ায় ঢেকে ফেলেন। একটা অজপাড়াগাঁর স্কুলে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে, সেই নিয়োগের প্রক্রিয়াটা নিয়ন্ত্রণ করেন এলাকার রাজনীতিকেরা, এমপি, মন্ত্রী, সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক। যাঁকে নেওয়া হয়, টাকা-পয়সা তো তাঁকে দিতে হয়ই, তাঁর দলীয় আনুগত্যও বিচার করা হয়। তারপর ওই শিক্ষক যদি কোনো দুর্নীতি বা অপরাধ করেন? তাহলে তাঁর বিচার করবেন কে? আইন, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সর্বত্র দলীয় পরিচয়-বিবেচনা। সবকিছু যদি রাজনীতির মাপকাঠিতে বিচার করা হয়, সবকিছু যদি চলে দলীয় পরিচয়ের যোগ্যতায়, তাহলে সবকিছু ভেঙে পড়তে বাধ্য। ধরা যাক, কথার কথাই বলছি, একজন পকেটমার হাটের মধ্যে পকেট কাটতে গিয়ে ধরা পড়ল। এখন যদি দেখা যায়, সে জবরপুর ইউনিয়ন পকেটমার লীগের বা দলের সভাপতি, আর ওই পকেটমারকে যে চৌকিদারের হাতে তুলে দেওয়া হলো, তিনি ওই এলাকার চৌকিদার লীগের বা দলের সভাপতি, তখন ওই চোরের বিচার কী হবে?
আমাদের নেতা-নেত্রীরা মনে করেন, সর্বত্র দলীয় লোক বসাতে পারলে দেশটা তাঁর নিয়ন্ত্রণে থাকে। আসলে ঘটনা উল্টো। দলের লোকেরও এক ভোট, দলের বাইরে যে ১৪ কোটি ২০ লাখ মানুষ আছে, তাদের মধ্যে যাঁরা প্রাপ্তবয়স্ক, তাঁদেরও মাথাপিছু এক ভোট। শুধু দলের ক্যাডারদের ভোট পেয়ে কোনো নেতা বা নেত্রী ক্ষমতাসীন হন না। সাধারণ ভোটারদের ভোটেই তাঁরা একবার জেতেন, একবার হারেন। কোনো একটা পদে যখন নির্লজ্জভাবে অযোগ্য কোনো দলীয় কর্মী/এলাকার মানুষ/নেতার আত্মীয়কে চাপিয়ে দেওয়া হয়, ওই পদপ্রত্যাশী আরও ১০০ জনই কেবল বঞ্চিত ও ক্ষুব্ধ বোধ করেন না, ওই ঘটনা যাঁরা জানেন-দেখেন, তেমন হাজার মানুষও ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত হন। সেই ক্ষোভ তাঁরা সঙ্গে সঙ্গে দেখান না। কিন্তু একটা দিন আসে, যখন ওই দলীয় বিচারে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি একটা ভুল বা অন্যায় করে বসেন। ভুল করার আশঙ্কা তাঁর পক্ষে বেশি, কারণ একে তো তাঁর ওই পদে বসার যোগ্যতা নেই, তার ওপর তিনি ভাবেন, আমি দলীয় পরিচয়ে নিযুক্ত হয়েছি, আমি সবকিছুর ঊর্ধ্বে, আমি কাউকে জবাবদিহি করতে বাধ্য নই। যেই না তিনি একটা ভুল করেন, যার সঙ্গে হয়তো দলের কোনো সম্পর্ক নেই, রাজনীতির কোনো যোগাযোগ নেই, তখন ওই ভুলের সব দায়িত্ব দলের ওপর এসে পড়ে, রাজনীতির ওপর এসে পড়ে।
এবার একটা বাস্তব উদাহরণ দিই। ডেইলি স্টার-এ ২৪ জুলাই ২০১১-এর প্রথম কলামের খবর এটা। চিয়ারস ফর পার্টিজান ট্রেডারস। দলীয় ব্যবসায়ীদের পোয়াবারো। ঘটনা কী? ঘটনা হচ্ছে, কুড়িগ্রামের বালিয়ামারী সীমান্তে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রথম সীমান্ত হাট চালু হয়েছে। দুই দেশের মানুষ করতালি দিয়ে এই হাটকে স্বাগত জানিয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশের বাণিজ্যমন্ত্রী এ উপলক্ষে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। খুবই ইতিবাচক একটা সংবাদ। মানুষের সঙ্গে মানুষকে প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হতে দেখলে, শত্রুতা নয়, বন্ধুত্ব বিনিময় করতে দেখলে কার না ভালো লাগে? কিন্তু ডেইলি স্টার লিখেছে, যে ২৫ জন ব্যবসায়ীকে ওই সীমান্ত হাটে স্টল দেওয়া ও ব্যবসা করার জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তাঁদের প্রত্যেকেই শাসক দলের সুপরিচিত কর্মী। আপনি একটা ব্যবসার সুযোগ যাঁদের দিচ্ছেন, তাঁদের শতকরা ১০০ ভাগই যদি আপনার কর্মী হন, তাহলে ওই এলাকার অ-কর্মী যে হাজার হাজার মানুষ আছেন, তাঁরা আপনার ওপর অনুরাগ দেখাবেন না বিরাগ দেখাবেন? ওই ২৫ জনের কোনো একজন যেদিন কোনো বড় অন্যায় বা ভুল করবে (আমরা চাই তাঁরা কোনো ভুল বা অন্যায় না করুন ও ভালোমতো ব্যবসা করুন), সেদিন হাজার হাজার মানুষ ঝাড়ু হাতে রাস্তায় নামবে।
সবকিছুর রাজনৈতিকীকরণ ও দলীয়করণ আমাদের বায়ুমণ্ডল বিষাক্ত করে তুলছে। এটা যে কেবল মহাজোট সরকার করে বা করছে তা নয়, বিএনপি-জামায়াতও তা-ই করেছিল। করেছিল বলেই কানসাট কিংবা যাত্রাবাড়ীর গণ-অসন্তোষ গণবিস্ফোরণে রূপ নিয়েছিল। আওয়ামী লীগ দল হিসেবে বড়, তার বিস্তার তৃণমূল পর্যন্ত, সংসদে মহাজোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা তিন-চতুর্থাংশ, তারা যদি দলীয়করণ করতে চায়, তখন সবকিছুই দলের ছায়ায় ঢেকে যায়। মানুষ শ্বাস নেওয়ার মতো পরিসর পায় না।
এ থেকে উত্তরণের উপায় কী?
উপায়টা জানার জন্য খুব বেশি কষ্ট করতে হবে না, সামান্য একটু কষ্ট করতে হবে। গত সংসদ নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কর্তৃক প্রচারিত নির্বাচনী ইশতেহার ২০০৮ একটু কষ্ট করে পাঠ করতে হবে। সবকিছু ওই দলিলে স্পষ্ট অক্ষরে লেখা আছে। ‘দলীয়করণমুক্ত অরাজনৈতিক গণমুখী প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করা হবে। যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা ও মেধার ভিত্তিতে সব নিয়োগ ও পদোন্নতি নিশ্চিত করা হবে।’ ‘বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা হবে। বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা হবে।’ ‘আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, শক্তিশালী স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন গঠন ও ন্যায়পাল নিয়োগ করা হবে। মানবাধিকার লংঘন কঠোরভাবে বন্ধ করা হবে।’ ‘সংসদকে কার্যকর করা হবে, সরকার সকল কার্যকলাপের জন্য জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবে এবং প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সম্পত্তির বিবরণী প্রতিবছর প্রকাশ করা হবে।’ ‘প্রতিটা নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে রাখা হবে।’ ‘ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পরিষদগুলোকে শক্তিশালী করা হবে।’ আর ওই নির্বাচনী ইশতেহারের প্রধান দুটো অঙ্গীকার ছিল, যা অগ্রাধিকার বলে ঘোষিত হয়েছিল—জিনিসপত্রের দাম কমানো এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করা, ঘুষ-চাঁদাবাজি ইত্যাদি বন্ধ করা। (আমি ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করছি বলে শব্দ এদিক-ওদিক হতে পারে, তবে অর্থের হেরফের হওয়ার আশঙ্কা কম)
এখন জনগণ যদি প্রশ্ন করে, পুলিশ কি রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে? প্রশাসনের নিয়োগ ও পদোন্নতির মাপকাঠি কি মেধা, দক্ষতা, যোগ্যতা? স্থানীয় সরকারকে কি কার্যকর করা হচ্ছে? আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে? বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কি বন্ধ হয়েছে? বিচার বিভাগ কি আগের চেয়ে বেশি স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারছে?
জনতা যখন দেখে, প্রচলিত আইনে বিচার পাওয়ার সম্ভাবনা নেই, তখনই তারা আইন হাতে তুলে নেয়। মহামান্য রাষ্ট্রপতি যদি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত খুনের আসামিকে ক্ষমা করে দেন, তখন মানুষ দিশেহারা বোধ করে। বলা হচ্ছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আইন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি বরাবর এই মর্মে আবেদন পাঠালে রাষ্ট্রপতির বিকল্প কিছু করার থাকে না। তাহলে আমাদের প্রশ্ন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কেন এটা পাঠাতে গেল?
সবকিছুতেই দলীয় বিবেচনা, সবকিছুরই রাজনৈতিকীকরণ। খুন ও খুনিরও রাজনৈতিকীকরণ চলছে। আর আছে রাজনীতিতে সমঝোতা ও মতৈক্য সৃষ্টির চেষ্টা বাদ দিয়ে সংঘাতের পথ বেছে নেওয়া। সংসদকে কার্যকর করার বদলে অকার্যকর করার চেষ্টা। সংবিধানের সংশোধনীতে এমন এক অনুচ্ছেদ যোগ করে দেওয়া, যার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭২-এর সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘আমি চাই আমার ফাঁসি হোক, এ সংশোধনীর বিরোধিতার জন্য ফাঁসি হলে তা হবে সম্মানের।’
আজ চারদিকে ভাঙনের সুর। দুঃসংবাদে আকীর্ণ সংবাদপত্রের পাতা। সবকিছু ভেঙে পড়ছে। আরও অনেক কিছুই বোধহয় ভেঙে পড়তে দেখতে হবে।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

Sunday, July 24, 2011

 মন্টুর ফাঁসি

হুমায়ূন আহমেদ

আমার জীবনের প্রথম উপন্যাসটির নাম নন্দিত নরকে। সেই উপন্যাসের একটি চরিত্র মন্টু তার বোন রাবেয়ার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে একটি খুন করে। জজ সাহেব তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। অসহায় পরিবারটির কিছুই করার থাকে না। তারা রাষ্ট্রপতির ক্ষমার আশায় বুক বাঁধে। রাষ্ট্রপতি ক্ষমাভিক্ষা দেন না। মন্টুর ফাঁসি হয়ে যায়।
উপন্যাসের রাষ্ট্রপতি নির্মম, কিন্তু বাস্তবের রাষ্ট্রপতিরা মমতা ও করুণায় আর্দ্র। তাঁরা ভয়াবহ খুনিকে ক্ষমা করে দেন। শুধু ফাঁসির হাত থেকে বাঁচা না, মুক্তি। এখন গলায় ফুলের মালা ঝুলিয়ে ট্রাক মিছিল করে বাড়ি ফিরতেও বাধা নেই।
নিহত ব্যক্তির স্ত্রী রাষ্ট্রের কাছে দুটি প্রশ্ন করেছেন:
১. প্রধানমন্ত্রী যদি তাঁর পিতার হত্যার বিচার চাইতে পারেন, আমার পিতৃহারা সন্তানেরা কেন বিচার চাইতে পারবে না?
২. রাষ্ট্রপতির স্ত্রী আইভি রহমানের হত্যাকারীদের যদি ফাঁসির আদেশ হয়, তিনি কি তাদের ক্ষমা করবেন?
নিহতের বিধবা স্ত্রী প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মতোই স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক। তাঁর অবশ্যই রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করার অধিকার আছে।
আমিও এই দুই প্রশ্নের উত্তর শোনার জন্য অপেক্ষা করছি। প্রশ্নের উত্তর শোনার পরপরই নন্দিত নরকে উপন্যাসটি নতুন করে লিখব। প্রথম আলো

Wednesday, July 13, 2011

অসাম্প্রদায়িক সরকারের ধর্মাশ্রয়ী রাষ্ট্রনীতি

বিরোধীদলীয় জোট ৪৮ ঘণ্টার হরতাল ডেকেছিল। তার পরই ইসলামি নামধারী—প্রচলিত ইসলামপন্থী বলব না—৩০ ঘণ্টার হরতাল ‘পালন’ করল অথবা করাল। উভয়েই সংবাদপত্রে বিবৃতি দিয়ে, টেলিভিশনে খবর প্রচার করে গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের কল্যাণে একটি কর্মসূচি পালন করেছে। সরকার বলছে, জনগণ হরতাল প্রত্যাখ্যান করেছে, পালনকারীরা বলছেন সফল হয়েছে। 
আমার একজন পাঠক হরতাল প্রত্যাখ্যান আর সফলতার দাবির সত্যতা জানতে চাননি। তিনি শুধু জানতে চেয়েছেন, কার হরতাল কে করেছে? পঞ্চদশ সংশোধনীতে বাহাত্তরে ফিরে যাওয়ার দোহাই দিয়ে কতিপয় ধারা সন্নিবেশিত বা বিলুপ্ত করা হলো। তার আগে আদালত পঞ্চম সংশোধনী পুরোপুরি না করে দায়সারাভাবে বাতিল করে কাদের খুশি করল। অপরদিকে ইসলামের জন্য মাতমকারীদের সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য ২-ক অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল শুধু নয়, ৭-ক যোগ করে খামিরা করা হলো। এই বিধান অমান্য করাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলা হলো। তাহলে দুটি হরতালের মাজেজা কী, এ যে উল্টো বুঝলি রাম! হরতাল তো করার কথা তাদের, যারা বাহাত্তরের সংবিধানের গণতান্ত্রিক বিধান বহাল রাখতে চায়, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, তাদের।
এবার বিস্তারিত আলোচনায় যাব। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল নিয়ে বিরোধী দলের হরতালের যৌক্তিকতা খুঁজে পাচ্ছি না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার এলে তো জরুরি অবস্থা আসবে হয়তো অথবা ১/১১-পরবর্তী আধা সামরিক শাসন জারি হবে। সেই সরকারের অধীনে নির্বাচন মেনে নিয়ে পরাজিত হলে সংসদ বর্জন অথবা ‘মানি না, মানি না’ বলে গাড়ি ভাঙচুর করা হবে। আবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল হওয়ায় দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে সমানে সমানে লড়াই হবে। এক দল ১০টি ব্যালট বাক্স ছিনতাই করলে অপর দল ২০টি পুড়িয়ে দিতে পারবে। পাল্টাপাল্টি ভোটকেন্দ্র দখল করে অবাধে সিল মারতে পারবে। জিজ্ঞেস করতে পারেন, তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কী করবে? তারা হাওয়া বোঝার চেষ্টা করবে, হাঙ্গামা বাধলে আকাশের দিকে গুলি করবে নাকি সম্ভাব্য বিজয়ী দলের শক্তি বৃদ্ধি করবে—সেই বিভ্রান্তি কাটাতে মগ্ন থাকবে? এদিকে যা হওয়ার হয়ে যাবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল নিয়ে একজন চিন্তাশীল বাস্তববাদী পাঠকের এই পর্যালোচনার পর এ নিয়ে বিরোধী দলের সাংবিধানিক কোনো বিতর্কে লিপ্ত হওয়ার কারণ খুঁজে পেলাম না। বরং প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে উপদেশ দেব, সমভাবে কুরুক্ষেত্রের জন্য তৈরি হোন। হোন্ডা জোগাড় করুন, গুন্ডাদের প্রশিক্ষণ দিন। বিরোধী দলকে বলব, ফারুকদের এখনই শহীদ হওয়ার প্রয়োজন নেই, অপেক্ষা করুন এবং আড়াই বছর পরে মহারণের জন্য প্রস্তুতি নিন।
এবার আসি ধর্মীয় লেবাস আর নামধারীদের ছোটখাটো হরতাল নিয়ে আলোচনায়। এই উপমহাদেশ বিভক্ত হয়েছিল ধর্মাশ্রয়ী অথবা ধর্মের জিকির আর ধর্মীয় উন্মাদনার রাজনীতির বিস্তারের কারণে। সেই উন্মাদনা স্তিমিত শুধু নয়, বিস্তার রোধে আওয়ামী মুসলিম লীগের অভ্যুদয় ঘটল। আজ ৬২ বছর পরে ভাবতে বসেছি, সেই আওয়ামী লীগ কোথায়? আওয়ামী মোসলেম লীগ থেকে ‘মুসলিম’ ছাঁটাই হলো। তারপর সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী আন্দোলন, স্বৈরতন্ত্রের অবসানে গণতন্ত্রের জন্য সশস্ত্র লড়াই। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের অর্জিত অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রটির গায়ে মুসলিম পরিচয় সেঁটে দিয়েছিলেন জিয়া-এরশাদ। আওয়ামী-প্রভাবিত সরকার ক্ষমতায় ফিরে এসে এবার সেটিতে ফেলিকন গ্লু লাগিয়ে দিল। ভাগ্যের কী পরিহাস, পূর্ব বাংলার মুসলমানদের গোঁড়া ধর্মীয় চেতনা থেকে অসাম্প্রদায়িক কিংবা ধর্মনিরপেক্ষ জাতিতে রূপান্তর ঘটিয়েছিল আওয়ামী লীগ। সেই দল কি ভূতের উল্টো পায়ে চলছে?
আরও বিশদ ব্যাখ্যা করি, সংবিধানে ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ স্বীকৃতি বহাল রেখেছে আওয়ামী সরকার। আবার দাবি করছে, পুরোনো সেই তত্ত্ব ও আদর্শের খোলস বহাল রেখে ধর্মনিরপেক্ষতায় আস্থাও বিসর্জন দেয়নি। অদ্ভুত এই গোঁজামিল যাঁর মস্তিষ্কপ্রসূত, তাঁর ধীশক্তির প্রশংসা করছি। পাকিস্তানের আদি যুগে আওয়ামী লীগ বাংলার মুসলমানদের বলেছিল, ইসলাম ধর্ম একটি ধর্মীয় বিশ্বাস, রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। এখন বলছে, এটি রাষ্ট্রীয় বিধান। 
বাহাত্তরের সংবিধানে অনুচ্ছেদ ১২ যখন সংবিধিবদ্ধ করা হয়, তখন ইনটেনশন বা উদ্দেশ্য তথা স্পিরিট কী ছিল? ধর্মনিরপেক্ষতা নীতি বাস্তবায়নের জন্য (ক) সর্বপ্রকার সাম্প্রদায়িকতা বিলোপ করা হইবে, ব্যাখ্যাটি আমার মতে সঠিক নয়। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মের কারণে বৈষম্য করা যাবে না। রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম মানে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিককে ইসলাম মানতে বাধ্য করা, একটি ধর্মের প্রতি বিশেষ অনুরাগ (খ) রাষ্ট্র কর্তৃক কোনো ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদা দান। এখন তো এক ডিগ্রি বাড়িয়ে ২-ক পরিচ্ছেদে একেবারে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে। (গ) রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মীয় অপব্যবহার। বাংলায় বলা হয়েছে, এসবই পরিত্যাজ্য, ইংরেজিতে ‘সিকিউলারিজম শ্যাল বি রিয়েলাইজড বাই এলিমিনেশন’ অর্থাৎ বিলুপ্তি ঘটিয়ে। তাহলে ২-ক পরিচ্ছেদে এরশাদের সংযোজিত ‘তবে’ অন্যান্য ধর্মও শান্তিতে পালন করা যাবে, এই ‘তবে’ মানে কী? 
ইংরেজি অনুবাদ বাট কি যথার্থ? কেউ যদি বলেন, ‘বাট’ মানে ‘হাউএভার’, আরও এক ডিগ্রি বাড়িয়ে বলেন ‘ইন এডিশন’, তা হলে কী ভয়ংকর শোনাবে! ২১(১) অনুচ্ছেদ সংবিধান ও আইন মান্য করা প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য। অর্থাৎ ‘রাষ্ট্রধর্ম’ একটি বিধান, সেই বিধান মান্য করা বাধ্যতামূলক। ‘তবে’ অন্য ধর্মও পালন করা যাবে। একদিকে রাষ্ট্রধর্ম মেনে লা-শারিক, তোমার কোনো অংশীদার বা সমতুল্য নেই বলব, আবার ‘তবে’ শব্দটির দ্বারা শিবের পূজা, মা-মেরির বন্দনা অথবা বুদ্ধের শরণকেও ‘সমমর্যাদা’ দেওয়া কি প্রবঞ্চনা নয়?
বাস্তবে ২-ক অনুচ্ছেদ ও প্রস্তাবনায় ‘বিসমিল্লাহ’ যোগ এবং ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ অনুচ্ছেদ সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যে সংবিধানটিতে ‘ফিরে যাব’ বলে আওয়ামী সরকারের বাগাড়ম্বর শুনেছি, আওয়ামী লীগের ৬২ বছরের বিবর্তন পর্যালোচনা করলে আমার মতো অনেকেই বুঝতে পারবেন, প্রথম দফায় ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর আওয়ামী লীগ, দ্বিতীয় দফায় শেখ মুজিব-তাজউদ্দীন-সৈয়দ নজরুল-কামরুজ্জামানের আওয়ামী লীগ, তৃতীয় স্তরে রাজ্জাক-তোফায়েলদের গণ-আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ আর বর্তমানের নব প্রজন্মের নতুন নেত্রীর পদানুযায়ী আওয়ামী লীগ এক নয়। যিনি রেসকোর্স ময়দানে বলেছিলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না’ আর তাঁর অনুসারী পরিচয়দানকারীরা সেই আদর্শের বলয় থেকে বেরিয়ে এসেছেন কী বাসনায়, তা কি বুঝিয়ে বলতে হবে? সত্যি বলতে, এই দেশে ধর্ম-উন্মাদনার রাজনীতিকে যাঁরা রুখে দিয়েছিলেন, তাঁদেরকে ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির প্রতিষ্ঠাকারী আজকের আওয়ামী লীগে খুঁজে পাই না। মওদুদিকে যাঁরা পল্টনে জনসভা করতে দেননি, তাঁদের এবং আজ যাঁরা আমিনীর সঙ্গে আপস বৈঠক করেন, তাঁদের চরিত্র ও আদর্শ এক হতে পারে না। 
হয়তো বলতে পারেন, কালের ও যুগের পরিবর্তনে সমসাময়িক অবস্থার সঙ্গে আপস করতেই হবে। তাঁরা বলবেন, বর্তমান আওয়ামী লেবাসের ক্ষমতাধারীরা সেই পুরোনো আপ্তবাক্যে বিশ্বাসী, ‘ইফ ইউ ক্যান্ট বিট দেম, জয়েন দেম।’ রাজনীতি এখন আমাদের আদিকালের ক্ষয়ে যাওয়া আদর্শবাদীদের জন্য নয়। এখন আদর্শবাদ হচ্ছে ক্ষমতার লড়াই, ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার পদ্ধতি প্রবর্তন। সমাজতন্ত্র বর্তমান মুক্তবাজার অর্থনীতিতে প্রয়োগ অবাস্তব। সমাজতন্ত্রের আদি অনুসারী সোভিয়েট রাশিয়া, তাদের অনুসারী চীন, এমনকি কিউবাও কতকাংশে মার্ক্স-এঙ্গেলস-লেনিনের সমাজতান্ত্রিক ধারণাকে বহু আগেই ময়লার ঝুড়িতে ফেলে দিয়েছে। তাই তো যাঁরা বলতেন ধর্মের ‘আফিম’ খাওয়ানো হয়, সেই মেনন-ইনুরা রাষ্ট্রধর্ম কায়েমের পক্ষে ভোট দেন। আমার একটি কৌতূহল ‘হ্যাঁ’ দস্তখত দেওয়ার আগে তাঁরা কি ‘বিসমিল্লাহ’ বলেছিলেন? আসলে তাঁদের অসাম্প্রদায়িকতা হচ্ছে শঠতার আবরণে ধর্মাশ্রয়ী রাষ্ট্রনীতি।
আজকের আলোচনার পঞ্চদশ সংশোধনীতে ধর্ম নিয়ে যে ‘জাগলারি’, ভোজবাজি বা মাদারির খেল দেখানো হয়েছে, তা আরও ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, রাষ্ট্র একটি নিরাকার বস্তু, রাষ্ট্রের ধর্ম মানে ইহার নাগরিক, অধিবাসী ও ভৌগোলিক সীমানায় বসবাসকারী সকল আবালবৃদ্ধবনিতা। তা হলে রাষ্ট্রধর্ম পালন একটি রাষ্ট্রীয় বিধান। এই বিধান কেউ অমান্য করলে, ইসলামি রীতিনীতিবিরোধী কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করলে, সংশোধিত ৭-ক অনুচ্ছেদের উপ-অনুচ্ছেদ-খ প্রযোজ্য হবে। ইহকালে সংশোধিত সংবিধান অমান্য করার শাস্তি চরম দণ্ড। এ রকম বিধান রয়েছে নতুন সংশোধিত ৭-ক(খ) অনুচ্ছেদে। বলা হয়েছে, ‘এই সংবিধান ও উহার কোনো বিধানের (এই ক্ষেত্রে আমার ব্যাখ্যা রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম পালন) প্রতি আস্থা, বিশ্বাস বা প্রত্যয় পরাহত করিলে তাহা রাষ্ট্রদ্রোহিতা হইবে।’ সেই রাষ্ট্রদ্রোহের শাস্তি সর্বোচ্চ দণ্ড অর্থাৎ ফাঁসি।
এই উপ-অনুচ্ছেদটি কি যারা রাষ্ট্রধর্ম ও ‘আল্লাহর ওপর আস্থা’ রাখবে না, সেই বিধর্মীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়? তবে হ্যাঁ, আগেই বলেছি, পরবর্তী বাক্যাংশে একটি ব্যতিক্রমের দোহাই দিয়ে সংখ্যালঘুদের প্রতি প্রবঞ্চনা তথা শঠতা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ অন্যান্য ধর্মকে সমান মর্যাদা দিবে, সমানভাবে পালন নিশ্চিত করিবে।’ অর্থাৎ তাঁরা সংবিধানের বিধান মেনে (না মানলে ফাঁসি) আল্লাহকে সর্বোচ্চে স্থান দেবেন। আবার তাঁদের নিজেদের ধর্মীয় আরাধ্যকে সমমর্যাদা দেবেন? এ যে মোনাফেকি অথবা ‘শেরেক’ কি না, ইসলামি পণ্ডিতেরা সেই ব্যাখ্যা দেবেন।
এবার আলোচনা করা যাক সংবিধানের প্রস্তাবনার ওপর সংশোধনী। জিয়ার পঞ্চম সংশোধনীতে আছে, ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’, যথার্থ বঙ্গানুবাদ ‘পরম দয়াময়, দয়ালু আল্লাহর নামে’। পঞ্চদশ সংশোধনীতে একটি হ্যাস চিহ্ন, ইংরেজিতে বলব অবলিক, বাংলায় ‘তথা’ যোগ করা হয়েছে ‘পরম সৃষ্টিকর্তার নামে’। তা হলে বুঝব, পঞ্চদশ সংশোধনকারীরা আল্লাহকে শুধু দয়াময় ও দয়ালু বলে ক্ষান্ত হননি, তিনি যে সৃষ্টিকর্তা, তা-ও আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। আবার একটি খাড়াদণ্ড (স্ট্রোক) দিয়ে সংবিধানের বিধানে ধর্মীয় বিভেদ সৃষ্টি করা হয়েছে। ইসলামপন্থীরা ‘আল্লাহ’কে স্মরণ করবেন, অন্য ধর্মাবলম্বীরা অন্য কোনো সৃষ্টিকর্তাকে। পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে যাঁরা লেজেগোবরে অবস্থা সৃষ্টি করেছেন, তাঁরা ইসলাম ধর্মাবলম্বী আর সংখ্যালঘু সম্প্রদায় উভয়কে একটি বাক্যাংশের ভিন্নার্থ করে ধোঁকা দিয়েছেন।
ধর্মীয় ব্যাখ্যা আর দেব না। শেষ করব। বিজ্ঞ ইতিহাসবিদ লেখক অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন ৯ জুলাই জনকণ্ঠ পত্রিকায় লিখেছেন, ‘এরশাদ যখন অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করেন, তখন শেখ হাসিনা বলেছিলেন, “অষ্টম সংশোধনী বিল এ দেশের মানুষের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জন্যই আসিয়াছে। ভবিষ্যতে সুযোগ পাইলে এই বিল বাতিল করিয়া দিব”।’ (ইত্তেফাক জুলাই ০৬, ১৯৮৮) তখন বলেছিলেন, ‘ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিকে লইয়া যাহারা যথেচ্ছা ব্যবহার করিতে চাহে, ধর্মকে তাহারা ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করে গদি রক্ষা করিতে চাহে।’ মামুন খালেদা জিয়াকে উদ্ধৃত করেছেন পত্রিকাটির একই সংখ্যা থেকে, ‘স্বৈরতান্ত্রিক সরকার ইসলামকে রাষ্ট্রীয় ধর্ম করার নামে জাতিকে বিভ্রান্ত করছে।’ মামুন লিখেছেন, ‘এখানেই শেষ নয়, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করার কারণে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত হরতাল ডেকেছিল।’
এখন আমার সেই সম্মানীয় পাঠককে বলতে হয়, আপনি সঠিক প্রশ্ন করেছেন, তারা হরতাল করল না, কার হরতাল কে করল?
এবিএম মূসা: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।
প্রথম আলো

Sunday, July 10, 2011

‘মৃদু আঘাত’ ও ‘হালকা নাশতা’র গণতন্ত্র!

বাংলা ভাষায় মৃদু শব্দটির সমার্থক শব্দ হলো নরম, সুকুমার, কোমল, আলত, হালকা, ক্ষীণ, অনুজ্জ্বল, শান্ত, ঠান্ডা ও উত্তেজনামুক্ত। এর কোনোটির সঙ্গে কি বিরোধী দলের চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুকের ওপর পুলিশের নির্মম ও নির্দয় নির্যাতনের ঘটনা মেলানো যায়? অথচ সেই মিলই খুঁজে পেয়েছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ। বুধবার এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি বলেছেন, ‘পুলিশের ধাক্কাধাক্কিতে বিরোধী দলের চিফ হুইপ মৃদু আঘাত পেতে পারেন। এ জন্য আমরা দুঃখিত। (প্রথম আলো, ৭ জুলাই, ২০১১)
জয়নুল আবদিন ফারুক যে আঘাত পেয়েছেনই, সে ব্যাপারেও হানিফ সাহেব নিশ্চিত নন। তিনি বলেছেন, ‘আঘাত পেতে পারেন।’ কথা হলো, এই মৃদু আঘাত পাওয়ার জন্য দেশের প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী—সবাই দুঃখ প্রকাশ করলেন। অবশ্য সবার দুঃখ প্রকাশও শর্তমুক্ত ছিল না। কেউ কেউ বলেছেন, ফারুক সাহেবের আঘাত পাওয়াটা দুঃখজনক। কিন্তু এ আঘাত তিনিই ডেকে এনেছেন। আজ যাঁরা ক্ষমতার তখতে বসে আছেন, তাঁরাও বিরোধী দলে থাকতে এ রকম বহুবার আঘাত ডেকে এনেছেন। বাংলাদেশে আঘাতপ্রাপ্ত না হয়ে কেউ ক্ষমতায় যেতে পারেন না। যিনি যত বেশিবার আঘাত পান, দল ক্ষমতায় গেলে তিনি তত বড় পদে বসেন।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জয়নুল আবদিন ফারুক সরকারি দায়িত্ব পালনে বাধা দিয়েছেন, বাস লক্ষ্য করে ঢিল ছুড়েছেন, অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেছেন। ১৫-১৬ জন ব্যক্তি রাস্তায় অবস্থান নিলেই ঢাকা মহানগরের জনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে এমন কথা পাগলও বলবে না। আমরা ধরে নিলাম, পুলিশের অভিযোগ সত্য। সরকার জনশৃঙ্খলা বিঘ্নকারীদের শায়েস্তা করতে ভ্রাম্যমাণ আদালত করেছে। পুলিশ তাঁকে সেই ভ্রাম্যমাণ আদালতে সোপর্দ করতে পারত। তারা তাঁকে গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করতে পারত। তা না করে যেভাবে তাঁকে লাঠিপেটা করল, রাস্তায় ফেলে দিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করল, গায়ের টি-শার্ট খুলে ফেলল—তার নজির সভ্য সমাজে নেই।
পুলিশ বলেছে, ফারুক সাহেব তাদের উসকানি দিয়েছেন, গালাগাল করেছেন। পুলিশ কি ফারুক সাহেবকে পাল্টা গালি দেয়নি? তারা কি শ্রীরামকৃষ্ণের মতো মধুর বাণী বর্ষণ করেছে? ‘শুয়োরের বাচ্চার দাঁত ফেলে দেব’ কি প্রেমের ভাষা?
যেসব বাচ্চা, শিশু-কিশোর টেলিভিশনে এই দৃশ্য দেখেছে, এসব অশালীন গালি শুনেছে, তারা কী ভাববে বড়দের সম্পর্কে, পুলিশ সম্পর্কে, জনপ্রতিনিধিদের সম্পর্কে। আমরা তাদের কী শিক্ষা দিচ্ছি? ক্ষমতাবানদের কি রুচি বলতে কিছু থাকবে না? পুলিশ হলেই কি মানুষ পেটাতে হবে? জনপ্রতিনিধি হলেই কি পুলিশের ওপর চড়াও হতে হবে?
সরকারের মন্ত্রীরা, সরকারি দলের নেতারা জয়নুল আবদিন ফারুকের বেয়াদবির কথা বলেছেন। কিন্তু সরকারি দলের সাংসদ আবদুর রহমান বদি সম্পর্কে কিছু বলছেন না। তাঁর হাত তো সব সময় নিশপিশ করে। এ পর্যন্ত বদি প্রকৌশলী পিটিয়েছেন, ম্যাজিস্ট্রেট পিটিয়েছেন, আইনজীবী পিটিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তা পিটিয়েছেন, মুক্তিযোদ্ধা পিটিয়েছেন, শিক্ষক পিটিয়েছেন, ঠিকাদার পিটিয়েছেন। কই, মুক্তিযোদ্ধা প্রেমিক সরকারের আইন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তো তাঁকে ধাওয়া করেনি। তাঁর বাড়ি ঘেরাও করে রাখেনি।
সংবাদ ব্রিফিংয়ে হানিফ সাহেব আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন, ‘জনগণ বিএনপি-জামায়াতের হরতাল ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে।’ হানিফ সাহেবের এই কথাটি সত্য হলে খুশি হতাম। প্রকৃতপক্ষে জনগণ হরতাল সমর্থনও করেনি, প্রত্যাখ্যানও করেনি। তারা ভয়ে ঘর থেকে নামেনি। নামলেও গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেনি। হানিফ সাহেবরা যতই লম্ফ-ঝম্ফ করুন না কেন—মহাখালী, গাবতলী, সায়েদাবাদ টার্মিনাল থেকে বাস ছাড়াতে পারেননি। সদরঘাট থেকে লঞ্চ ছাড়াতে পারেননি। যে ঢাকা শহরে যানজটের কারণে রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, সেই ঢাকা শহরের ভিআইপি রোডে রিকশার দুরন্ত ছুটে চলাকে স্বাভাবিক অবস্থা বলে? পুলিশ প্রহরায় গুটিকয়েক বাস-মিনিবাস চলাচল করলেই হরতাল জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়ে যায়?
কই, সরকার তো শত চেষ্টা করেও ঢাকার দোকানপাট সচল করতে পারেনি। মার্কেট চালু রাখতে পারেনি। স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় খোলা রাখতে পারেনি। রাস্তায় মানুষ যা-ও নামত, ছাত্রলীগ-যুবলীগের শান্তি মিছিলের ভয়ে নামেনি। আগের আওয়ামী লীগ আমলে হাজী সেলিমের নাইন শুটারের কথা মানুষ ভোলেনি।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষায়, হরতালে বিএনপির নেতাদের ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান খোলা থাকলেও দেশ অচল ছিল, মানুষ অচল ছিল, জীবনযাত্রা স্থবির ছিল। তৈরি পোশাক কারখানাগুলো চালু থাকলেও পণ্য পরিবহন হয়নি। হরতালে সরকারি দলের নেতা-মন্ত্রী-সাংসদেরা উদ্বিগ্ন না হলেও সাধারণ মানুষ উদ্বিগ্ন। দক্ষিণাঞ্চল থেকে নির্বাচিত একজন সরকারদলীয় সাংসদ—নিজের নামেই যিনি সুপরিচিত—তিনি বলেছেন, প্রাইভেট গাড়ি নিয়ে শহরে ঘুরেছেন। হরতালের কোনো প্রভাব তিনি দেখেননি। কোথাও পিকেটিং ছিল না। কিন্তু যাঁদের গাড়ি নেই, তাঁরা তো ঘরে বন্দী ছিলেন। মাননীয় সাংসদ বলবেন কি, যদি কোথাও পিকেটিংই না থাকবে তাহলে রাস্তায় কেন এত পুলিশ নামানো হলো? পুলিশ প্রহরায় কয়েকটি বাস-মিনিবাস চললেও তাতে যাত্রীসংখ্যা কত ছিল? ভ্যানে করে বৃষ্টির মধ্যে রোগীকে নিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়েছে। মাননীয় সাংসদ যদি তাঁর গাড়িতে তাঁকে হাসপাতালে পৌঁছে দিতেন, বুঝতাম তিনি জনগণের বন্ধু।
আমরা এ কোন গণতন্ত্রে আছি? বিএনপির আমলে বঙ্গবন্ধু এভিনিউর আওয়ামী লীগ অফিস অবরুদ্ধ থাকে, আওয়ামী লীগ আমলে নয়াপল্টনে বিএনপির অফিস পুলিশ ঘেরাও করে রাখে। একই প্রজাতন্ত্রের পুলিশ দ্বৈত ভূমিকায়। বিএনপি আমলে কোহিনুরদের পোয়াবারো, আওয়ামী লীগ আমলে হারুন-বিপ্লবদের? গণতন্ত্রের নামে এই লাঠিতন্ত্র কত দিন চলবে?
আওয়ামী লীগের নেতারা এখন যেভাবে পুলিশের সাফাই গাইছেন, বিএনপির আমলে বিএনপির নেতারাও তাদের সাফাই গাইতেন।
এখন বিএনপির নেতারা বলছেন, হরতাল গণতান্ত্রিক অধিকার। গণতন্ত্রকে বাঁচাতে, মানুষ ও দেশকে বাঁচাতে তাঁরা হরতাল পালন করছেন। এই কথাগুলো তাঁরা ক্ষমতায় থাকতে কেন বললেন না? আবার আওয়ামী লীগ বলছে, বিরোধী দল হরতাল ডেকে দেশকে, দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করছে। বিরোধী দলে থাকতে কেন তাদের এ উপলব্ধি হলো না? রাজনীতি কি শুধু ক্ষমতায় যাওয়া ও থাকার সিঁড়ি? যেকোনো উপায়ে ক্ষমতায় থাকতে হবে, যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় যেতে হবে—এই ধনুর্ভঙ্গপণ নিয়ে নেতা-নেত্রীরা রাজনীতি করেন। তাঁরা জনগণের কথা ভাবেন না। ভোটারদের প্রতি আস্থা রাখেন না। রাখলে একটি দেশে নির্বাচন নিয়ে এত পরীক্ষা-নিরীক্ষা, এত বিতর্ক হতো না। একবার তাঁরা গণতন্ত্র বাঁচাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা করেন। আরেকবার তত্ত্বাবধায়ক-ব্যবস্থা বাতিল করেন। অর্থাৎ যখন যেমন, তখন তেমন।

২.
লেখাটি শুরু করেছিলাম ‘মৃদু আঘাত’ দিয়ে। শেষ করতে চাই ‘হালকা নাশতা’ দিয়ে। পাঠকের নিশ্চয়ই মনে আছে, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে যে গ্রেনেড হামলা হয়েছিল, তার প্রধান টার্গেট ছিলেন শেখ হাসিনা। তাঁকে হত্যা করতে চার-চারবার চেষ্টা চালিয়েছিল ঘাতকেরা। আটক হুজি নেতা মুফতি আবদুল হান্নান তাঁর জবানবন্দিতে বলেছেন, শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনার সময় তাঁরা একটি কোড (সাংকেতিক ভাষা) ব্যবহার করতেন। সেটি হলো ‘শেখ হাসিনাকে হালকা নাশতা’ করাতে হবে। হালকা নাশতা মানে হলো শেষ করে দেওয়া। এই হালকা নাশতা করাতে মাওলানা তাজউদ্দিন পাকিস্তানের লস্কর-ই-তাইয়েবার নেতা মজিদ ভাট্টির কাছ থেকে অত্যাধুনিক আর্জেস গ্রেনেড নিয়ে এসেছিলেন। লস্কর-ই-তাইয়েবা পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের সৃষ্টি। তারা পাকিস্তানকে ধ্বংস করেছে। এখন বাংলাদেশের দিকে হাত বাড়িয়েছে। রাজনীতিতে এ ধরনের প্রতিহিংসা ও জিঘাংসা পুষে রাখার পরিণাম কী ভয়ংকর, তা দেশবাসী দেখেছে।
বাংলাদেশে সব দলই এমনভাবে ক্ষমতার কাঠামো তৈরি করে, প্রশাসনযন্ত্র সাজায়, যাতে আজীবন ক্ষমতায় থাকা যায়। ক্ষমতার বাইরে, দলীয় চিন্তা-চেতনার বাইরে তারা কিছুই ভাবতে পারে না। অথচ দুই প্রধান দলের মধ্যে আদর্শগত পার্থক্য অনেকটাই ঘুচে যাচ্ছে, পুরোপুরি না গেলেও। আওয়ামী লীগ বিএনপির বিসমিল্লাহ এবং এরশাদের রাষ্ট্রধর্মকে গ্রহণ করেছে। জিয়া ও এরশাদের সামরিক শাসনকে আদালত পুরোপুরি অবৈধ ঘোষণা করলেও আওয়ামী লীগ কিন্তু রাজনৈতিক বৈধতা দিয়েছে। আমরা পছন্দ করি বা না করি, এটি জাতীয় মতৈক্যের ভিত্তি হতে পারত। কিন্তু হলো না কেন? বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের সেই বিখ্যাত উক্তিটি মনে পড়ে। তিনি বলেছিলেন, চেয়ার তো একটি, দাবিদার দুজন। একজনকে চেয়ারে বসতে হলে আরেকজনের বাইরে থাকতে হয়। কিন্তু সেটি কেউ মেনে নিতে পারছেন না। সেও না হয় মানা গেল, কিন্তু ক্ষমতায় থাকতে বিরোধী দলকে নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্র!
২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলার সম্পূরক চার্জশিটে যেসব তথ্য আছে, তা ভয়ংকর। হত্যার সঙ্গে বিএনপির কোন কোন নেতা জড়িত ছিলেন, তা প্রমাণসাপেক্ষ। কিন্তু দলের অনেক রাঘববোয়াল এবং প্রশাসনের অনেক চাঁই যে অপরাধীদের বাঁচাতে সচেষ্ট ছিল, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। না হলে জজ মিয়া কাহিনি সাজানো হলো কীভাবে?
আজ সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা, সাবেক পুলিশপ্রধানদের কারাগারে পাঠানো নিয়ে অনেকে প্রশ্ন করছেন; দেশের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। কিন্তু সেদিন অপরাধীদের বাঁচাতে কোন খেলায় মেতেছিলেন তাঁরা? ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলাটি তো মিথ্যা নয়। মিথ্যা নয় সেই হামলায় ২২ জন মানুষের মৃত্যু ও কয়েক শ মানুষের আহত হওয়ার ঘটনা। আমরা মনে করি, বাংলাদেশের রাজনীতিতে সুস্থ ধারা ফিরিয়ে আনতে এ হামলার রহস্য উদ্ঘাটন জরুরি।
বাংলাদেশে ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করে পরের বার ক্ষমতায় যাওয়ার নজির নেই। যে কারণে বিএনপির সংবিধানে চতুর্দশ সংশোধনী এনেছিল। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। এবারেও আওয়ামী লীগ যদি একই উদ্দেশ্যে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে থাকে, তার ফলও তাদের ভোগ করতে হবে। জনগণ না চাইলে কোনো সংশোধনীতেই কাজ হবে না। আবার জনগণ চাইলে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে নির্বাচন করেও বিএনপি-জামায়াতের জয়ী হওয়া আটকানো যাবে না। তাই আগামী নির্বাচন নিয়ে বিএনপির এত আকুলি-বিকুলির প্রয়োজন নেই। মধ্য মেয়াদে এসে সরকার যেভাবে অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, তাতে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনেও ভরাডুবি ঠেকাতে পারবে না। পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় থাকতেই নির্বাচন হয়েছিল। অতি সম্প্রতি থাইল্যান্ডে বিতাড়িত থাকসিনের দলই নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে। ২০০৬ সালে, মাত্র পাঁচ বছর আগে ভোট কারচুপির কারণে জনগণ যে দলকে বিতাড়িত করেছিল, সেই দলকেই সে দেশের মানুষ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিজয়ী করেছে।
গণতন্ত্রকে ষড়যন্ত্রমুক্ত করতে চাইছে বর্তমান সরকার। ভালো কথা। কিন্তু নিপীড়নমুক্ত করবে কে? দুটোই সমান বিপজ্জনক।
‘মৃদু আঘাত’ কিংবা ‘হালকা নাশতা’র রাজনীতি কেবল মঞ্চে নয়, মন থেকেও মুছে ফেলতে হবে। সেই কঠিন কাজটি করতে পারবেন কি শেখ হাসিনা? পারবেন কি খালেদা জিয়া?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohৎab03@dhaka.net

Wednesday, July 6, 2011

‘পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছ’


undefined
একটি দেশ কতটা গণতান্ত্রিক, তা নিরূপিত হয় সেই দেশের সিভিল সোসাইটি বা নাগরিক সমাজের শক্তি-সামর্থ্য ও কার্যকর ভূমিকার ওপর। যে দেশে নাগরিক সমাজ যত শক্তিশালী, সে দেশের গণতন্ত্রও তত মজবুত বলে ধরে নেওয়া হয়। এ প্রসঙ্গে আমরা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মার্কিন নাগরিক সমাজের সাহসী ভূমিকা স্মরণ করতে পারি। মার্কিন সরকার মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করলেও সে দেশের নাগরিক সমাজ স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের সমর্থন করেছে এবং অনেক সময় সিদ্ধান্ত পরিবর্তনেও সরকারকে বাধ্য করেছে। আমরা তুলনা করতে পারি অধুনা ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে। পাকিস্তানে নাগরিক সমাজ দুর্বল বলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাও ভঙ্গুর। ভারতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা টেকসই বলে সেখানে শক্তিশালী নাগরিক সমাজ গড়ে উঠেছে। আন্না হাজারে ও রামদেবের সাম্প্রতিক দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। অনশনকারী আন্না হাজারেকে লাঠিপেটা না করে সরকার তাঁর দাবি মেনে লোকপাল প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেয়। একই সঙ্গে তিনি প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বাংলাদেশে এ দৃশ্য ভাবা যায় না। এখানে কেউ সরকারপ্রধানের সঙ্গে দেখা করলে আওয়ামী লীগের দালাল এবং বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে বৈঠক করলে বিএনপির এজেন্ট হয়ে যাবেন। অর্থাৎ, মানুষকে মাপা হয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাটখারায়। যেন এই দুই দলের বৃত্তের বাইরে কেউ থাকতে পারেন না। তবে এই অপবাদের জন্য নাগরিক সমাজের সুবিধাবাদিতাও কম দায়ী নয়। তারা নিজ নিজ সুবিধামতো কখনো দলীয় হয়, কখনো নাগরিক সমাজের ভূমিকা পালন করে, কখনো নিরপেক্ষ থাকে।
নাগরিকমাত্রই নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি নন। যে দেশে বিশাল জনগোষ্ঠী সব ধরনের নাগরিক-মানবিক অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত, সে দেশে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা এক অর্থে সুবিধাভোগী। অন্তত তাঁরা সামাজিকভাবে এমন অবস্থানে আছেন, যাঁরা অন্যের অধিকার ও সুযোগের কথাটি ভাবতে পারেন। জনগণের অগ্রসর অংশ হিসেবে এটি তাঁদের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্বও বটে। সাধারণত লেখক, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাংবাদিক, চিকিৎসক, আইনবিদ, কৃষিবিদ, প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার অগ্রসর অংশকে নাগরিক সমাজ ভাবা হয়। তবে শর্ত হলো, তাঁরা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সরাসরি জড়িত হবেন না, রাষ্ট্রক্ষমতা ভোগ করবেন না। নাগরিক সমাজ বিবেকের তাড়নায় তাদের দায়িত্ব পালন করবে। সমাজে ন্যায় ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করবে।
আমাদের দেশে পাকিস্তান আমল থেকে নাগরিক সমাজ সক্রিয় ও সাহসী ভূমিকা রেখে আসছে। আমরা যদি ভাষা আন্দোলনের দিকে তাকাই, দেখব, তা ছিল প্রকৃতই একটি নাগরিক উদ্যোগ। আমরা যদি ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রজন্মশত বর্ষ উদ্যাপন কিংবা ১৯৬৭ সালে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার বন্ধের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দোলনের দিকে তাকাই, সেখানেও নাগরিক সমাজের মুখ্য ভূমিকা ছিল। রাজনীতিকেরা এসেছেন পরে, পেছনে পেছনে।

২.
স্বাধীন বাংলাদেশে নাগরিক সমাজের সবচেয়ে সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকা ছিল আশির দশকে। স্বৈরাচারী এরশাদ শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া, আলপনা আঁকা ইত্যাদি বেদাত কাজ বলে ফরমান জারি করলে এ দেশের লেখক, শিল্পী, শিক্ষাবিদ তথা নাগরিক সমাজ প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে, যা সাংগঠনিক রূপ পায় ‘সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট’ নামে। সে সময় কেবল সংস্কৃতিসেবী নন, লেখক, আইনবিদ, চিকিৎসক, কৃষিবিদ, শিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষও গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় জোরালো ভূমিকা রেখেছিলেন। আমরা স্মরণ করতে পারি ৩১ জন বুদ্ধিজীবীর সেই বিখ্যাত বিবৃতির কথা, যা স্বৈরাচারী এরশাদের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। তাঁরা ছিলেন বিভিন্ন মতের অনুসারী। সাতাশি, আটাশি, ঊননব্বই ও নব্বইয়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও রাজনীতিকদের পাশাপাশি নাগরিক সমাজ প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেছিল। বুদ্ধিজীবীদের দৃঢ়প্রত্যয় এবং পেশাজীবীদের সম্মিলিত আন্দোলন রাজনীতিকদের সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। সেদিন সাংবাদিকেরা এরশাদের কঠোর সেন্সরশিপের প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন কলম বন্ধ রেখে। নব্বইয়ের জরুরি অবস্থায় ২৭ নভেম্বর থেকে ৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশে কোনো পত্রিকা প্রকাশিত হয়নি। এখন সাংবাদিক সমাজও বহুধাবিভক্ত। সাংবাদিকতা পেশায় দলীয়করণের পাশাপাশি দুর্বৃত্তায়নও ঢুকে গেছে। যাঁরা পেশার প্রতি সৎ ও বস্তুনিষ্ঠ, তাঁদের নানাভাবে নাজেহাল হতে হয়। অপপ্রচার ও আক্রমণের শিকার হতে হয়।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, ১৯৯১ সালে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার পরই নাগরিক সমাজের সেই সাহসী ভূমিকা আর লক্ষ করা যায়নি। নাগরিক সমাজের অধিকাংশ প্রতিনিধি এখন ‘এ-দলে ও-দলে’ ভাগ হয়ে সুবিধা আদায়ে ব্যস্ত। ক্ষমতা বদলের পর কেউ কেউ লোভনীয় পদে আসীন হন; যাঁরা এখন বঞ্চিত, তাঁরা পরবর্তী সরকারের জন্য অপেক্ষা করেন। বিএনপির আমলে ড্যাব, আওয়ামী লীগের আমলে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ সারা দেশে চিকিৎসকদের পদায়ন ও পদোন্নতি দেয়। এভাবে প্রতিটি পেশাজীবী গোষ্ঠী আওয়ামী লীগ ও বিএনপি শিবিরে বিভক্ত হয়ে আছে। ১৯৯৮ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরোধিতাকারী ১০১ জন বুদ্ধিজীবী নিয়ে একটি নাগরিক ফোরাম গঠিত হওয়ার পর ২০১ জন নিয়ে পাল্টা নাগরিক সংগঠন করা হয় সরকারের সমর্থনে। আমাদের জানতে ইচ্ছে করে, আওয়ামী লীগের প্রতি দরদ উথলে ওঠা সেই ২০১ বৃদ্ধিজীবী এখন কে কোথায় আছেন।
অধুনা বিএনপিপন্থী ১০১ সদস্যের নাগরিক ফোরাম আবার সক্রিয় হয়েছে। তারা এখন ‘হাওয়া ভবন’ নেতার মুক্তির দাবিতে সেমিনার-সভায় গরম বক্তব্য দিলেও বিএনপির আমলে দেশব্যাপী বোমা-গ্রেনেড হামলা কিংবা রাজনৈতিক হত্যা, সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিরুদ্ধে টুঁ শব্দটি করেনি। আবার সেদিন যাঁরা বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাস ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন, তাঁরা এখন চুপচাপ। তাঁদের কেউ ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে আঁতাত করে নানা পদ-পদবি বাগিয়ে নিয়েছেন, আবার কেউ ‘কিছুই পেলাম না’ বলে হতাশ হয়ে ঘরে বসে আছেন।

৩.
দেশের ক্রান্তিকালে নাগরিক সমাজের কাছে সৎ, সক্রিয় ও কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা প্রত্যাশিত। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ সেই ভূমিকা রাখতে পেরেছে বলে মনে হয় না। তাদের অধিকাংশ ‘একের ভেতরে তিন’— নাগরিক সমাজের সদস্য, এনজিওর কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক দলের আস্থা বা বিরাগভাজন। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি বলে পরিচিত আইনজীবীরা আদালত চত্বরে মারামারি করেন, সাংবাদিকেরা ভাগ হয়ে ‘জিন্দাবাদ’ ‘মুর্দাবাদ’ স্লোগান দেন, শিক্ষকেরা নীল-সাদা দলে ভাগ হয়ে পদ-পদবির জন্য উন্মুখ থাকেন। তাঁদের বিবেক পাঁচ বছরের জন্য জাগ্রত ও পাঁচ বছরের জন্য ঘুমন্ত থাকে। নাগরিক সমাজের ‘অব.’ নামে আরেক শ্রেণীর প্রতিনিধি আছেন, যাঁরা স্বৈরাচারী-আধাস্বৈরাচারী সব সরকারের গুণকীর্তন করে এখন জাতির বিবেক সেজেছেন। তাঁদের অনেকে বিভিন্ন এনজিওর সঙ্গে যুক্ত।
নাগরিক সমাজের অংশ হিসেবে এনজিওগুলো কতটা স্বাধীন ভূমিকা রাখতে পারে, সে ব্যাপারেও সংশয় আছে। তারা সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করে। বেসরকারি সংস্থার অর্থ ছাড়ে, রেজিস্ট্রেশন নবায়নে কতগুলো প্রতিষ্ঠানের কাছে জবাবদিহি করতে হয়, সেগুলো দেখা নিশ্চয়ই নাগরিক সমাজের কাজ নয়। নাগরিক সমাজ কথা বলবে সরকারি-বেসরকারি নির্বিশেষে সত্য, ন্যায় ও মানবাধিকারের পক্ষে, গণতন্ত্রের পক্ষে। তাদের ভূমিকা হবে যাত্রাপালার বিবেকের মতো। সত্য বলে যাবে। তারা বিদেশি শক্তির এজেন্ডা বা প্রকল্প নিয়ে কাজ করবে না। তারা সরকারের এজেন্ডা নিয়েও কাজ করবে না। কাজ করবে জনগণের এজেন্ডা নিয়ে। সম্প্রতি ভারতে আন্না হাজারে যে কাজটি করেছেন, বিনায়ক সেন যে কাজটি করেছেন, সেটিই হলো প্রকৃত নাগরিক সমাজের দায়িত্ব। এ কাজ ব্যক্তির উদ্যোগে হতে পারে, সাংগঠনিকভাবে হতে পারে। বাংলাদেশে সে রকম কাউকে এগিয়ে আসতে দেখা যায় না। কেন? আমাদের সমাজে কি সাহসী মানুষের অভাব? মোটেই না। কিন্তু একজন অরুন্ধতী রায় কিংবা বিনায়ক সেন তৈরি হতে যে ভয়মুক্ত পরিবেশ দরকার, সেই পরিবেশ বাংলাদেশে এখন অন্তত নেই।

৪.
সম্প্রতি নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তারা সরকারের নানামুখী চাপে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁরা বলেছেন, গণতন্ত্র ও সুশাসন নিশ্চিত করতে শক্তিশালী নাগরিক সমাজের বিকল্প নেই। কয়েক মাস আগে টিআইবি বিচার বিভাগ নিয়ে একটি জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করলে আদালত তাদের কাছে কৈফিয়ত তলব করেন। কয়েকটি স্থানে মামলা হয়। শেষ পর্যন্ত বিচারক কমিটির কাছে তাদের জবাবদিহিও করতে হয়। বাংলাদেশ সফরে আসা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মন্ত্রী, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের মন্ত্রীরাও গণতন্ত্র টেকসই করতে শক্তিশালী নাগরিক সমাজের গুরুত্বের কথা বলেছেন। নাগরিক সমাজ মানেই বহু মত, তর্ক-বিতর্ক, সমালোচনা। সরকার যদি কোনো সমালোচনাই সহ্য না করে, তারা যা করছে সেটাই উত্তম ভাবে, তাহলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সংহত হবে কী করে? আমাদের রাজনীতিতে ভিন্নমতের সুযোগ নেই। দলীয় নেতা বা নেত্রী যা বলেন, সেটাই শেষ কথা। সে ক্ষেত্রে ভিন্নমত ও সমালোচনা আসতে পারে নাগরিক সমাজ থেকে।
বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ এখন উচ্চকণ্ঠ, তা বলা যাবে না। অনুচ্চ, ক্ষীণ তাদের কণ্ঠ। তার পরও সরকার কিংবা বিরোধী দল তাদের সহ্য করতে পারে না। বিচারবহির্ভূত হত্যা, দলীয় মাস্তানি, হরতাল-অবরোধ ইত্যাদির বিরুদ্ধে কথা বললেই নেতা-নেত্রীরা খড়্গহস্ত হন। ধমক দিয়ে, চাপ দিয়ে কিংবা উৎকোচ ও উপঢৌকন দিয়ে সমালোচনা বন্ধ করতে চান। স্তব্ধ করতে চান ভিন্নমতের কণ্ঠস্বর। আমরা এমন গণতন্ত্র চাই না, যে গণতন্ত্রে মানুষ কথা বলতে ভয় পায়, সরকারের সমালোচনা করলে জেল খাটতে বা হয়রানির শিকার হতে হয়। গণতান্ত্রিক দেশে কখনোই নাগরিক সমাজের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় না। যদি ফুরিয়ে যায়, বুঝতে হবে আমাদের কপালে আরও অনেক দুঃখ আছে।
মাছের পচন ধরে যেমন মাথা থেকে, সমাজের পচন ধরে তার মাথা অর্থাৎ লেখক, বুদ্ধিজীবী, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, সাংবাদিক তথা নাগরিক সমাজ থেকে। সরকার ভুল করলে, বিরোধী দল ভুল করলে; আমলাতন্ত্র, পুলিশ বাহিনী বা ব্যবসায়ীরা অন্যায় করলে মানুষ যাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকে, তাঁরা হলেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি। কিন্তু তাঁরাই যদি ভুল পথে চালিত হন, নিশ্চুপ থাকেন, তাহলে জনগণের ভরসাস্থল বলে কিছু থাকে না। বাংলাদেশের দিগ্ভ্রান্ত নাগরিক সমাজের বর্তমান ভূমিকা দেখে বঙ্কিম চন্দ্রেরকপাল কুণ্ডলা উপন্যাসে নবকুমারকে লক্ষ্য করে নায়িকার বিখ্যাত উক্তির কথাই মনে হয়: ‘পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছ’।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohৎab03@dhaka.net

Twitter Delicious Facebook Digg Stumbleupon Favorites More